আজ রবিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২১ || ৪ মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ রবিবার, ০৮:৪০ অপরাহ্ন
শনিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২০   |   sonalisandwip.com
স্বাধীনতা : জীবনের, যৌবনের, মননের, উত্তরণের

কাজী জিয়া উদ্দিন

রক্ত আর অশ্রু অবিনশ্বর নয়, কিন্তু বাঙালী এই করুণ কোমল অশ্রু বিন্দু আর রক্তের লাল ফোঁটাকে দিয়েছে অবিনশ্বর স্থাপত্য। বায়ান্ন’র একুশে ফেব্রয়ারী আমাদের প্রথম অশ্রু বিন্দু, একাত্তর আমাদের বিশাল এক রক্তের ফোঁটা। রক্ত আর অশ্রু নিয়েই লাল-সবুজের বাংলাদেশ।

ভাষা আন্দোলনের রক্তস্রোত ধরেই ঊনিশশ’ একাত্তরের উত্থান ঘটেছে বাংলাদেশের। বাঙালির আত্মপরিচয়ের এ গৌরবময় ইতিহাস পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলে রয়েছে বৈষম্যহীন, শোষণহীন এক সমাজের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ধর্ম-নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক জীবনচেতনা ও প্রগতিশীল এক বাংলাদেশের স্বপ্ন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; যে আবেগ, বিশ্বাস, চিন্তা একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখায়, গণতন্ত্র ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে শেখায়, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, ভবিষ্যৎমুখি, অভিন্ন জাতিসত্তায় প্রণোদিত করে, তা-ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

যে চেতনা একটি ধারাবাহিক ইতিহাস আছে; আছে হাজার বছরের সংগ্রাম এবং লক্ষ মানুষের রক্তে রাঙানো জীবন-কাহিনী।

বায়ান্ন’র একুশে ফেব্রয়ারী রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রথম নিজেদের সনাক্ত করতে পেরেছিল-‘আমরা বাঙালি’। এই আত্মপরিচয় বাঙালিকে অস্তিত্ব সচেতন করে তোলে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন, ১৯৬১ সালে রবিন্দ্র-জন্মশত বার্ষিকী পালনে বাধাদান, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ- আমাদের সামগ্রিক অর্জনেরই পর্যায়ক্রমিক ধাপ।

বাঙালির মুক্তচেতনা এভাবে ধাপে ধাপে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায় এবং বিশ্বের মানচিত্রে স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রের গৌরবময় পতাকা উত্তোলন করতে সক্ষম হয়।

যুদ্ধটা ছিল পাকিস্তান রাষ্টের বিরুদ্ধে। সে যুদ্ধের সুত্রপাত একাত্তরে নয়, বায়ান্নতেই। বায়ান্ন ছিল একটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী-সামন্তবাদবিরোধী অভ্যুথান। তারই সূত্র ধরে নানা ঘটনা ও অভিজ্ঞতা পরম্পরায় একাত্তরের অভ্যুদয়। ভ্রুণ থেকে শিশুর জণ্মের মতোই অনিবার্য। সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটি বিদেশী, অপরটি স্বদেশী। একটি নবীন, অপরটি প্রাচীন ইত্যাদি, ইত্যাদি।

কিন্তু তারা আবার মিত্রও। এরা সোনায় সোহাগা। সাম্রাজ্যবাদই সোনা, সামন্তবাদ সোহাগা। একটি ছিল বৃটিশ এর, অপরটি ছিল পাকিস্তানের। সাম্রাজ্যবাদেরই ছত্রছায়ায় সামন্তবাদ রক্ষিত থাকে।

স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু একাত্তর থেকেই। কিন্তু তার আগেরও একটা ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের একটা ধারাবাহিকতাও রয়েছে, একাত্তর তারই পারম্পর্যে এসেছে, হঠাৎ করে ঘটেনি। একাত্তর বাংলাদেশের মানুষের জীবনে এক বিভিষীকাময় ঝড় বয়ে নিয়ে আসে। প্রাকৃতিক দৃর্যোগ ও দেশের ওপর দিয়ে অনেক গেছে, অনেক বার; মানবিক দুর্যোগও গেছে, বহুবার, দুর্ভিক্ষ হয়েছে, মারা গেছে শত শত মানুষ। একাত্তর ওই রকমেরই একটা প্রলয়ংকারী দুর্যোগ, তবে প্রাকৃতিক নয়, পুরোপরি মানব সৃষ্ট। এটি ছিল এক আত্মরক্ষার, অধিকার আদায়ের প্রতিরোধ যুদ্ধ। মানুষ আক্রমনকারীকে মেনে নেয়নি। লড়াই করেছে।

এ ভূমি অতীতে বহুবার বিজিত হয়েছে । বিদেশীরা এসে দখল করে নিয়েছে । সে সব যুদ্ধ ছিল রাজায় রাজায় যুদ্ধ। জনগণ তাতে অংশ নেয়নি । একাত্তরে নিয়েছে । ওই যুদ্ধ জনগণের যুদ্ধ । সব মানুষের । এবং এতে হানাদারদের হটিয়ে দেওয়া হয়েছে । এ দেশের আপামর জনগণই এ মহাকর্মযজ্ঞ সাধন করেছে । জনগণ দহন ও ক্ষরণের মধ্য দিয়ে তার ন্যায্য অধিকার আদায়ের যুদ্ধে জয়ী হয়েছে ।

যুদ্ধের পুরো নয় মাস ধর্ষণ ও লাঞ্ছনার কালো সময় পার করেছে বাংলাদেশের নারীরা। আসাদ চৌধুরী তাঁর কবিতায় সেই নির্যাতন প্রত্যক্ষ করার জন্য বিশ্ব বিবেককে আহবান জানিয়েছেন এভাবে-

“টু-উইমেন ছবিটা দেখেছ বারবারা ? 
গীর্জায় ধর্ষিতা সোফিয়া লোরেনকে দেখে নিশ্চয় কেঁদেছিলে আমি কাঁদিনি, বুকটা শুধু খাঁ খাঁ করেছিলো
সোফিয়া লোরেনকে পাঠিয়ে দিয়ো, বাংলাদেশের তিরিশ হাজার রমণীর নির্মমতার অভিজ্ঞতা শুনে তিনি শিউরে উঠতেন।”

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পুরো দেশ যেন মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়। শহরগুলো যেন হঠাৎ বধ্যভূমি হয়ে যায়। শকুনের মতো আকাশে উড়তো শত্রুর বিমান, মেশিনগান খই ফোটাতো যত্রতত্র। আমাদের একজন প্রথিতযশা কবি তখন দেশের অবস্থাকে তুলনা করেছেন পাবলো পিকাসোর আঁকা ‘গুয়ের্নিকা’ ছবির মতো।

আকৈশোর আমার চোখে ‘গোয়ানির্কা ‘- ই বাংলাদেশ
আমি স্পেনের মতো বিশালকায় এই উপমহাদেশে
মানুষের ভালোবাসা ও শ্রমের সুগন্ধ নিতে নিতে
বারবার ফিরে আসছি প্রিয় জন্মভূমি- এই ‘গোয়ার্নিকায়’।

পাবলো পিকাসোর আঁকা বিশ্ববিখ্যাত ছবি ‘গুয়ের্নিকা’ স্পেনো গৃহযুদ্ধে ধবংসপ্রাপ্ত একটি গ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেছে এই কবির কাছে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ। দেশমাতৃকার মতো এদশের নারীরাও হয়েছে ছিন্ন- ভিন্ন ধর্ষিতা, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানেই এক দুঃখময় অতীত, যন্ত্রণাদগ্ধ এক অধ্যায়।

যে আকাঙ্খা ও চেতনার ভিত্তিতে আমাদের মহান স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, তা সমুন্নত রেখে আমাদের লোকজও দেশজ ঐতিহ্য, আদর্শ ও জীবনবোধের প্রতি পূর্ণ প্রদ্ধা রেখে মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।

অতীতের যে সকল প্রতিবন্ধকতার দেয়াল এখনও দাঁড়িয়ে আছে, সে সব দেয়াল সরিয়ে একটি নতুন দিগন্তের খোলা জানালা আমাদেরকে স্থাপন করতে হবে। পারস্পরিক সংহতিবোধ ও সম্প্রীতির আবহে বিকসিত হয়ে আমাদের অদম্য প্রাণশক্তি ও সুজনশীল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সমাজ মানসে একটি পরিবর্তনের সূচিমুখ খুলে দিতে হবে।

আমরাই হবো ‘আলোকিত মানুষ’, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।

লেখক - অতিঃ ডিআইজি