আজ সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০ || ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ সোমবার, ০৭:৫০ পূর্বাহ্ন
বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০১৯   |   sonalisandwip.com
মরহুম আলহাজ্ব মাওলানা নজির আহমদ (রহ:) স্মরণে

সন্দ্বীপের বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন, সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান, হাজার হাজার আলেমের ওস্তাদ, সাদা মনের মানুষ, সবার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন আলেম ও আবেদ, আমার পরম শ্রদ্ধেয় দাদা সন্তোষপুর নিবাসী (সাবেক হুদ্রাখালী ও কাটগড়) গাছুয়া-কাটগড় ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসার সাবেক উপাধ্যক্ষ ও মুহাদ্দিস হযরত আল্লামা আলহাজ্ব মাওলানা নজির আহমদ (রহ:)। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালবাসা সন্দ্বীপের সকল স্তরের মানুষের রয়েছে। লোক মুখে রয়েছে তাঁর বুজুর্গীর খ্যাতি। অতি সরল ও সাদাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হুজুরকে অকৃত্রিমভাবে ভালোবাসতো সন্দ্বীপের লোকজন। তাঁর অগণিত ছাত্র তাঁকে পরম শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে স্মরণ করবে সারা জীবন। তাঁর দীর্ঘ কর্ম জীবনে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসায় পুত্রতুল্য ¯েœহে শিক্ষা দিয়েছিলেন ছাত্রদের এবং গভীর ভালোবাসায় সাধারণ মানুষকেও আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁর স্বভাব সুলভ বিনয় ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার কারণে।

আজীবন এক নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক ছিলেন আলহাজ্ব মাওলানা নজির আহমদ (রহ:)। তাঁর হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে সন্দ্বীপের অনেক কৃতি সন্তান, হাজার হাজার আলেম, যারা এখন দেশ  বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং সরকারি ও বেসরকারি চাকুরিজীবী। তাঁর অসংখ্য ছাত্র দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন: মক্তব, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অফিস আদালতে সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত আছেন। মাওলানা নজির নামে তিনি সারা সন্দ্বীপে একনামে পরিচিত।

মাওলানা নজির আহমদের জন্ম ০৬/১০/১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ (জাতীয় পরিচয় পত্র অনুযায়ী) উত্তর সন্দ্বীপের হুদ্রাখালী গ্রামের কালামিয়া হাজীর বাড়িতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর বাবার নাম আলহাজ্ব আব্দুর রশীদ আর মায়ের নাম আতরেন নেছা। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী, দয়ালু এবং ধার্মিক মহিলা ছিলেন। তৎকালীন উত্তর সন্দ্বীপের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট ধর্মানুরাগী ও সমাজহিতৈষী জনাব কালামিয়া হাজী ছিলেন তাঁর বড় ভাই। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তাঁর মা-বাবার চতুর্থ সন্তান। 

শৈশবে গৃহ শিক্ষক মৌলভীর কাছে আরবী ভাষার হাতেখড়ি। মাওলানা নজির আহমদ (রহ:) সন্দ্বীপ কালাপানিয়া হেদায়েতুল ইসলাম মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য তিনি কাটগড় ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসায় ভর্তি হন। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন যথাক্রমে চট্টগ্রামের চাহারিয়া মাদ্রাসা হাটহাজারী ও নোয়াখালী ইসলামিয়া মাদ্রাসায়। অতঃপর উচ্চতর শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ মাদ্রাসায় গমন করেন। সেখানে চার বৎসর কৃতিত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করে দাওরায়ে হাদিস (টাইটেল) ডিগ্রী অর্জন করেন। মাওলানা নজির আহমদ মাতৃভাষা বাংলার পাশাপাশি আরবী, ফার্সি ও উর্দূ ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন।

দারুল উলূম দেওবন্দের পড়াশোনা শেষ করে তিনি মাতৃভূমি সন্দ্বীপে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে প্রথমে নিজ প্রতিষ্ঠান কাটগড় ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। সেখান থেকে সন্দ্বীপের ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সন্তোষপুর হোসাইনিয়া কাসেমুল উলূম মাদ্রাসায় দীর্ঘ ৭ বৎসর সফলতার সহিত শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে তিনি পুনরায় কাটগড় ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস পদে যোগদান করেন। নিরবচ্ছিন্ন প্রায় ৩৬ বৎসর ঐ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শেষে ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে উপাধ্যক্ষ হিসাবে চাকুরী থেকে অবসর নেন আলহাজ্ব মাওলানা নজির আহমদ (রহ:)। অত্যধিক সততা ও দক্ষতার সহিত তিনি তাঁর কর্মজীবন অতিবাহিত করে অবসরে যান।
পৃষ্ঠা-১
তাঁর সমগ্র জীবন সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, মানবসেবা ও ইবাদত বন্দেগী করে কাটিয়েছেন। পাক্কা একজন ঈমানদার ও নামাজী ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তাঁর জীবনে নামাজে কোনদিন অবহেলা দেখা যায় নাই। আল্লাহ ভীতি তাঁর মধ্যে প্রকট ছিল। ছোট বড় সবাইকে তিনি সালাম করতেন। আমার ধারণামতে তাঁর মত সৎ মানুষ বর্তমান সমাজে অতি বিরল। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি একজন জনপ্রিয় ইসলামী ব্যক্তিত্ব হিসাবে নিজ মাতৃভূমি সন্দ্বীপে নন্দিত হন।

দারুল উলূম দেওবন্দের ছাত্র হিসেবে বহু প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও তৎকালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের কাছে ইলমে হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান লাভের সুযোগ পান তিনি। এদের মধ্যে ছিলেন, ক্বারী মোহাম্মদ তৈয়্যব, বুখারী শরীফের শিক্ষক মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী, মুসলিম শরীফের শিক্ষক আল্লামা ইব্রাহীম বালিয়াবী এবং তিরমিযি-আবুদাউদ শরীফের শিক্ষক শায়খুল আদব এজায আলী প্রমুখ। দারুল উলূম দেওবন্দের প্রাতিষ্ঠানিক র্শিক্ষা অর্জন সমাপ্ত করার পর তিনি বিশ্ব বরেণ্য আধ্যাত্মিক রাহবার আওলাদে রাসুল হযরত মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ:) এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন।

১৯৯৮ সালে তিনি পবিত্র হজব্রত পালন করেন। পারিবারিক জীবনে মাওলানা নজির আহমদ (রহ:) ছিলেন একজন সফল বাবা ও সুখী মানুষ। তিনি ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের জনক। সবাই উচ্চ শিক্ষিত ও স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাসেম পলাশ ও জিয়া ফার্টিলাইজার সার কারখানায় একজন সফল (অবসর প্রাপ্ত) সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি তিনি একজন আধ্যাত্মিক শাইখও ছিলেন। তিনি সমাজ কল্যাণ মূলক কর্মকান্ড ও দাওয়াতি কাজে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তিনি অত্যন্ত শান্তি প্রিয়, বিনয়ী, সদালাপী ও মৃদুভাষী ছিলেন। তিনি সন্দ্বীপের স্বনামধন্য পীর শাইখুল হাদিস সন্তোষপুর হোসাইনিয়া কাসেমুল উলূম মাদ্রাসা সহ অসংখ্য মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ ইদ্রিস (রহ:) এর সমসাময়িক ছাত্র হিসাবে এক সাথে দারুল উলূম দেওবন্দে লেখাপড়া করেন।

দীর্ঘদিন অবসর যাপনের পর বার্ধক্যজনিত কারণে প্রায় ৯৮ বৎসর বয়সে এ মহান আলেমে দ্বীন ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জুন বুধবার সকাল ৮:০০ ঘটিকার সময় সন্তোষপুর তাঁর নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজেউন। সন্তোষপুর উচ্চ বিদ্যালয় (আব্দুল হক মাস্টারের গো স্কুল) মাঠে মরহুমের সুযোগ্য সন্তান মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস এর ইমামতিতে বিশাল জানাযা শেষে সন্তোষপুর গ্রামে নিজ প্রতিষ্ঠিত বাড়ি সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

আলহাজ্ব মাওলানা নজির আহমদ (রহ:) ছিলেন তাঁর বংশের (কালামিয়া হাজীর পরিবারের) একজন সফল ব্যক্তিত্ব ও কৃতি শিক্ষাবিদ।

মহান রবের দরবারে ফরিয়াদ, হে আমাদের রব! আমাদের হুজুরকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসাবে কবুল করে নিন। আমীন!
-০-

# মুহম্মদ হুমায়ুন কবির ছিদ্দিকী *

* লেখক : সন্দ্বীপ সন্তান, একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী এবং মরহুমের অত্যন্ত প্রিয় ভাজন ছাত্র ও নাতি।

(ঢাকা-২৮ জানুয়ারি ২০১৯ খ্রি.)